“ধর্মের ফতোয়ার শিকার হয়ে চিকিৎসার অভাবে কোন মায়ের মৃত্যু না হোক”

আমরা কোন যুগে বাস করছি? বিজ্ঞান যখন মঙ্গলে বসতি স্থাপনের কথা ভাবছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন প্রতিনিয়ত অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলছে, ঠিক তখনও আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর মানুষ ধর্মের অপব্যাখ্যা আর ফতোয়ার অন্ধকার জালে আটকে আছে। আর এই অন্ধত্বের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের মা-বোনদের—নিজেদের জীবন দিয়ে।

গর্ভধারণ এবং সন্তান প্রসবের মতো একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল সময়ে একজন নারীর প্রয়োজন সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা, সহানুভূতি এবং বিজ্ঞানসম্মত যত্ন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজও কিছু কিছু অঞ্চলে তথাকথিত মৌলবাদী ও ফতোয়াবাজদের গোঁড়ামির কারণে নারীরা আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ফতোয়া যখন চিকিৎসার পথে দেয়াল

আজও অনেক পরিবারে অন্ধ ধর্মান্ধতার কারণে গর্ভবতী মাকে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়। তথাকথিত ‘পর্দা’ আর ‘পাপ-পুণ্যের’ মনগড়া দোহাই দিয়ে হাসপাতালে না নিয়ে, কোনো হাতুড়ে ডাক্তার বা ওঝা-বৈদ্যের ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করা হয়।

যখন একজন মায়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে, যখন তার ও তার গর্ভের সন্তানের জীবন সুতোয় ঝুলে থাকে, তখনও এক শ্রেণীর কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ ফতোয়ার দোহাই দিয়ে আধুনিক চিকিৎসাকে ‘হারাম’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ বলে প্রচার করে। ফলশ্রুতিতে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অথবা বিনা চিকিৎসায় ছটফট করতে করতে একজন মায়ের কোল খালি হয়ে যায়, কিংবা মা নিজেই চিরতরে হারিয়ে যান।

“যে ফতোয়া বা অন্ধ বিশ্বাস একজন মুমূর্ষু মায়ের জীবন বাঁচাতে বাধা দেয়, তা কখনো কোনো পবিত্র ধর্মের অংশ হতে পারে না। ধর্ম এসেছে মানুষের কল্যাণের জন্য, মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়।”

একবিংশ শতাব্দীর এই লগ্নে দাঁড়িয়ে যখন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জটিল সব রোগ নিরাময়ে অভাবনীয় সাফল্য দেখাচ্ছে, ঠিক তখনই আমাদের সমাজের এক অন্ধকার কোণে ধর্মের অপব্যাখ্যা ও ফতোয়ার করাল গ্রাসে অকালে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য মায়ের প্রাণ। সন্তান প্রসব এবং মাতৃত্বকালীন জটিলতার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা সেবাকে অস্বীকার করে কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরার এই প্রবণতা কেবল অনভিপ্রেত নয়, বরং এটি একটি সুপ্ত সামাজিক ব্যাধি, যা প্রতিনিয়ত নারীদের ঠেলে দিচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও, প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে এখনও একটি বড় অংশের নারী প্রসবকালীন সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। এর পেছনে অর্থনৈতিক দৈন্যতার চেয়েও বড় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ফতোয়াবাজদের মনগড়া ফতোয়া। গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকাগুলোতে আজও এক শ্রেণীর মৌলবাদী ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ প্রচার করে যে, নারী চিকিৎসকের অভাব থাকলে পুরুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া ‘ধর্ম পরিপন্থী’। ফলস্বরূপ, প্রসবকালীন তীব্র রক্তক্ষরণ (PPH) কিংবা এক্লাম্পশিয়ার (Eclampsia) মতো জরুরি মুহূর্তেও গর্ভবতী মাকে হাসপাতালে না নিয়ে ঘরে আটকে রাখা হয়, অথবা হাতুড়ে ডাক্তার ও ওঝা-বৈদ্যের ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করা হয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতিকে স্রেফ ‘চিকিৎসার অভাব’ হিসেবে দেখতে নারাজ; তাঁদের মতে এটি মূলত একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক হত্যাকাণ্ড’। যখন একজন মায়ের জীবন ও তাঁর গর্ভস্থ সন্তানের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ে, তখন তথাকথিত সামাজিক মর্যাদা, পর্দা প্রথার ভুল ব্যাখ্যা এবং ধর্মীয় ট্যাবুকে জীবনের চেয়ে বড় করে দেখা হয়। অথচ, পৃথিবীর প্রধান সব ধর্মেই মানুষের জীবন রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ এবং পবিত্রতম কর্তব্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামের সুনির্দিষ্ট বিধান ও ফিকাহ শাস্ত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জরুরি চিকিৎসাক্ষেত্রে জীবনের সুরক্ষার তাগিদে যেকোনো সাধারণ নিয়মের শিথিলতা স্পষ্টভাবেই অনুমোদিত। তা সত্ত্বেও, এক শ্রেণীর অর্ধশিক্ষিত বা স্বঘোষিত ধর্মীয় ফতোয়াবাজরা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, যার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে নারীদের।

এই সংকটের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো বাল্যবিয়ে এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জোরপূর্বক গর্ভধারণ। লিসার মতো ১৪-১৫ বছরের কিশোরীদের যখন শারীরিক ও মানসিকভাবে অপরিপক্ক অবস্থায় বিয়ে দেওয়া হয়, তখন তাদের প্রসবকালীন ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এই বয়সে নারীদের শ্রোণিদেশ বা পেলভিস (Pelvis) একটি পূর্ণাঙ্গ সন্তান প্রসবের জন্য প্রস্তুত থাকে না। এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যখন মৌলবাদী চিন্তাধারার পরিবারগুলো জোরপূর্বক সন্তান উৎপাদনে বাধ্য করে এবং পরবর্তীতে জটিলতা দেখা দিলে আধুনিক চিকিৎসা নিতে বাধা দেয়, তখন মৃত্যু অবধারিত হয়ে ওঠে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাতৃমৃত্যুর এই ধারা বন্ধ করতে হলে কেবল স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। প্রথমত, গ্রামীণ স্তরে ইমাম, ধর্মীয় নেতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে প্রসবকালীন চিকিৎসার ধর্মীয় বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যারা ফতোয়া জারি করে বা ভুল বুঝিয়ে কোনো রোগীকে আধুনিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করবে, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রকে প্রতিটি নাগরিকের, বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে আইনি ও প্রশাসনিক নজরদারি বাড়াতে হবে।

একটি প্রগতিশীল ও সভ্য সমাজে কুসংস্কারের দোহাই দিয়ে কোনো মায়ের জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অন্ধত্বের অন্ধকার দেয়াল ভেঙে বিজ্ঞান ও মানবতার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছানো আজ সময়ের দাবি। ধর্মের সঠিক মানবিক রূপকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানকে আলিঙ্গন করে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে—ভুল ফতোয়া ও অন্ধ বিশ্বাসের বলি হয়ে এ দেশের বুকে আর কোনো মায়ের কোল যেন কখনো খালি না হয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *