১০০ দিনে ৬০০ প্রাণ: মৌলবাদের উত্থান নাকি আইনি শাসনের পরাজয়?

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো অর্জন হতে পারে না। কোনো সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে মূলত তাদের ভবিষ্যত নীতি ও প্রশাসনিক দক্ষতার পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এই সূচনাতেই যখন শত শত তাজা প্রাণের অকাল ঝরে যাওয়ার পরিসংখ্যান সামনে আসে, তখন তা কেবল শাসনব্যবস্থার ওপরই প্রশ্ন তোলে না, বরং পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ পথচলাকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনেই দেশে ৬ শতাধিক অর্থাৎ প্রায় ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর পাশাপাশি একাধিক অপহরণ, সংঘাত এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো আশঙ্কাজনক অপরাধ চিত্রিত হয়েছে। চ্যানেল ২৪সহ মূলধারার গণমাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে সমাজচিন্তক ও মুক্তমনা মানুষের মনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ব্যাপকভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে—এই বিপুল প্রাণহানি কি কেবলই প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা, নাকি এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে অন্ধ মৌলবাদ ও উগ্রপন্থার নীরব বিস্তার?

যেকোনো সমাজে যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে বা তারা তাদের পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন তার প্রত্যক্ষ সুযোগ নেয় চরমপন্থী ও অশুভ শক্তিসমূহ। উগ্র মৌলবাদী মানসিকতা কখনোই আইনের শাসন বা নাগরিকের বাকস্বাধীনতাকে বরদাশত করে না। টিআইবির এই রক্তক্ষয়ী পরিসংখ্যানের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ সহিংসতাই ঘটেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উগ্র সামাজিক উস্কানি এবং অন্ধ চেতনার প্রশ্রয়ে। যখন একটি রাষ্ট্রে আইনের সুশাসন থাকে না, তখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। আর এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ব্যবহার করেই মৌলবাদী ভাবধারা ধীরে ধীরে শিকড় ছড়াতে শুরু করে। ধর্ম বা অন্ধ চেতনার দোহাই দিয়ে প্রতিপক্ষকে দমন, ভিন্নমত নির্মূল এবং সামাজিক ভীতি তৈরি করা তাদের মূল হাতিয়ারে পরিণত হয়।

যদিও পুলিশ ও তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই পরিসংখ্যানের ধরন ও হিসাব নিয়ে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করেছে এবং দ্বিমুখী মতামত সামনে এনেছে, তবুও সাধারণ নাগরিকের জীবনের ঝুঁকি কিন্তু কাগজের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একটি জীবন ঝরে যাওয়া মানে কেবল একটি সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নয়, বরং একটি পরিবার ধ্বংস হওয়া এবং পুরো সমাজে আতঙ্কের বীজ রোপিত হওয়া। প্রথম ১০০ দিনের এই চিত্র আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, যখনই রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয় বা মৌলবাদী ভাবধারাকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যবহার কিংবা তোষণ করা হয়, তখন সমাজ তার ভারসাম্য হারায়। আইনি শাসনের পরাজয় যেখানে নিশ্চিত হয়, ঠিক সেখানেই মৌলবাদের উত্থান ঘটে এক অনিবার্য পরিণতি হিসেবে।

কোনো অন্ধ চেতনা বা চরমপন্থী ভাবধারা কখনোই একটি আধুনিক ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। সহিংসতা দিয়ে যে ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি হয়, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের রক্তেই রঞ্জিত হতে থাকে। টিআইবির প্রকাশিত এই রিপোর্টটি আসলে আমাদের সমাজের জন্য এক তীব্র সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, অবিলম্বে আইনি কাঠামোর কঠোর সংস্কার, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রয়োগ এবং অন্ধ মৌলবাদী অপশক্তির আস্ফালন দমন করা না গেলে এই রক্তক্ষরণ থামানো সম্ভব নয়। মুক্তচিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা এবং সর্বোচ্চ নাগরিক নিরাপত্তাই পারে একটি সমাজকে এই অন্ধকারের গহ্বর থেকে টেনে তুলতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি বিচারহীনতার এই ধারাবাহিকতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেব, নাকি আইনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে উগ্রপন্থার কড়া জবাব দেব—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *