“ফতোয়ার শৃঙ্খল ভেঙে জাগুক শিক্ষিত সমাজ: প্রথার অন্ধকার নাকি আইনের সুশাসন?

একটি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের জীবন, মর্যাদা এবং নিরাপত্তার মূল গ্যারান্টি হলো দেশের সংবিধান ও সর্বজনীন আইনি ব্যবস্থা। আইন যদি সকলের জন্য সমানভাবে কার্যকর থাকে এবং দেশের বিচার ব্যবস্থা যদি স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়, তবেই একটি সমাজকে সভ্য সমাজ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় বারবার একটি চিত্র সামনে চলে আসে—যেখানে রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিংবা মফস্বল এলাকায় অসাংবিধানিক ফতোয়া, সামাজিকভাবে একঘরে বা বয়কট করা এবং বিচারবহির্ভূত সামাজিক নির্যাতনের মতো ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। কুমিল্লা বিভাগের মুরাদনগর কিংবা চান্দিনার মতো এলাকাগুলোতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এই সামাজিক ব্যাধির এক বাস্তব প্রতিফলন। যখন কোনো ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বা স্থানীয় প্রথাগত সালিশদার নিজেদের দেশের প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থার ঊর্ধ্বে মনে করে যেকোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়, তখন তা কেবল আইনশৃঙ্খলার অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে না, বরং পুরো সমাজকে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বেদনাদায়ক দিকটি হলো—এই সামাজিক অবক্ষয় ও বেআইনি ফতোয়াবাজির চিত্র প্রকাশ্যে আসার পরও দেশের তথাকথিত শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ বেশিরভাগ সময় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

ফতোয়া ও বিচারবহির্ভূত শাস্তির সংস্কৃতি কীভাবে একটি সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেয়, তা গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি। ফতোয়াবাজির মূল উৎস হলো উগ্র মৌলবাদী মানসিকতা, অন্ধ সংস্কার এবং প্রথাগত ভীতি। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো খুব ভালো করেই জানে যে, একটি সমাজে যখন মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার প্রসার ঘটবে, তখন তাদের কায়েমী স্বার্থ এবং অন্ধ নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়বে। তাই তারা সাধারণ মানুষের অসচেতনতা, প্রথাগত ভয় এবং ধর্মান্ধতাকে পুঁজি করে এক ধরনের বিচারহীনতার রাজত্ব তৈরি করতে চায়। ব্যক্তি আক্রোশ মেটাতে, নারীদের স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করতে, কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীদের মুখ বন্ধ করতে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ বা ‘সামাজিক অবক্ষয়’-এর কাল্পনিক অজুহাত তৈরি করে সামাজিক বয়কট ও শারীরিক নির্যাতনের পথ বেছে নেওয়া হয়। অথচ আমাদের সংবিধান ও উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী যেকোনো ধরনের ফতোয়া জারি করা বা বিচারবহির্ভূত সামাজিক শাস্তি প্রদান করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং চরম দণ্ডনীয় অপরাধ। রাষ্ট্র যেখানে প্রতিটি নাগরিককে আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার মৌলিক অধিকার দিয়েছে, সেখানে কীভাবে একটি গোষ্ঠী আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থা চালাতে পারে—এই প্রশ্নটিই মূলত আইনের সুশাসন ও প্রথার অন্ধকারের মূল দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।

প্রথার এই ভয়াল অন্ধকার ও ফতোয়ার শৃঙ্খল বজায় থাকার পেছনে মূল কারণ কিন্তু কেবল উগ্রপন্থীদের উপস্থিতি নয়, বরং শিক্ষিত সমাজের অপরাধমূলক নীরবতা। শিক্ষা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের চিন্তাশক্তিকে মুক্ত করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করা এবং সমাজে যুক্তিবাদ ও প্রগতির আলো ছড়ানো। কিন্তু আমরা যখন দেখি মুরাদনগরের মতো অঞ্চলে বেআইনি ফতোয়ার মাধ্যমে কোনো নিরীহ পরিবার বা ব্যক্তির জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হচ্ছে, অথচ স্থানীয় শিক্ষক, আইনজীবী, ডাক্তার কিংবা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ নিশ্চুপ হয়ে থাকেন, তখন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। প্রগতিশীল চেতনার অভাব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার এই প্রবণতা উগ্রবাদীদের আরও বেশি বেপরোয়া হতে সাহায্য করে। শিক্ষিত সমাজ যখন ভয়ে কিংবা নিষ্ক্রিয়তায় নীরব হয়ে থাকে, তখন অন্ধ কুসংস্কার ও ফতোয়াবাজেরা সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় এবং নিজেদের সিদ্ধান্তকে পুরো এলাকার ‘আইন’ হিসেবে চালিয়ে দিতে সাহস পায়। একটি সমাজের ধসের জন্য কেবল অপরাধীদের অপরাধ দায়ী নয়, বরং ভালো ও শিক্ষিত মানুষের নীরবতা সমানভাবে দায়ী—এই ঐতিহাসিক সত্য আজ আমাদের সামনে দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্র ও সচেতন নাগরিক সমাজ উভয়কেই দ্বিমুখী লড়াইয়ে নামতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, দেশের সীমানার ভেতরে কোনো ধরনের সমান্তরাল বিচারব্যবস্থা বা ফতোয়ার রাজত্ব গ্রহণযোগ্য নয়। যেখানেই ফতোয়া জারি হবে বা প্রথার নামে আইনের তোয়াক্কা না করে কোনো মানুষকে হেনস্তা করা হবে, সেখানেই প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু কেবল আইনি প্রয়োগ দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, যদি না প্রথার অন্ধকার দূর করতে শিক্ষিত সমাজ নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলন, যুক্তিবাদী পাঠ চর্চা এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানসিকতা তৈরি করতে শিক্ষিত সমাজকে গ্রামীণ ও মফস্বল অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে প্রথাগত অন্ধ বিশ্বাস কোনো বিচার হতে পারে না; একমাত্র সংবিধান এবং আইনি সুশাসনই তাদের অধিকারের আসল রক্ষাকবচ। ফতোয়ার এই প্রাচীন শিকল ভেঙে যদি শিক্ষিত সমাজ আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার না হয়, তবে আমাদের সমস্ত প্রগতি ও আধুনিকতার দাবি কেবল কাগজের পাতাতেই বন্দি থেকে যাবে, আর সমাজ ধীরে ধীরে গ্রাসিত হবে এক অনন্ত অন্ধকারের অতল গহ্বরে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *