লিসার বিয়ে ১৪ বছরে, তারপর মৃত্যু: একটি সামাজিক হত্যাকাণ্ড ও আমাদের অন্ধত্ব

১৪ বছর বয়সটা কেমন হওয়ার কথা ছিল? হাতে বই-খাতা, বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, আকাশে ওড়ার স্বপ্ন আর এক বুকভরা চপলতা। কিন্তু আমাদের এই তথাকথিত সভ্য সমাজের এক কোণে, লিসা নামের একটা মেয়ের ১৪ বছর বয়সটা কেটেছে এক নরককুণ্ডে। আর সেই নরকের সমাপ্তি ঘটল অত্যন্ত নির্মমভাবে—একটি তাজা প্রাণের অকাল মৃত্যুতে।

না, একে কোনোভাবেই ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ বলা চলে না। এটি একটি পরিকল্পিত সামাজিক হত্যাকাণ্ড। আর এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর আমাদের সমাজের শিকড় গেড়ে বসা অন্ধ মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতা।

শ্রীকাইল গ্রামের সেই অন্ধকার অধ্যায়

ঘটনাটি কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানার শ্রীকাইল গ্রামের। এই গ্রামেরই এক কোণে লিসা নামের মেয়েটি বড় হচ্ছিল। কিন্তু তার অপরাধ ছিল, সে এমন এক পরিবারে জন্মেছিল যেখানে মানুষের চেয়ে অন্ধ মতাদর্শের মূল্য বেশি। লিসার বাবা ছিলেন তথাকথিত মৌলবাদী গোষ্ঠী ও মোল্লা সিকদার আমিনের অন্ধ অনুসারী।

যে বয়সে লিসার কাঁধে স্কুলের ব্যাগ থাকার কথা ছিল, সেই বয়সে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো সংসারের বোঝা। তার পরিবার, তার নিজের বাবা-মা, ধর্মের দোহাই দিয়ে এবং মৌলবাদী চিন্তাধারায় মগজ ধোলাই হয়ে লিসাকে জোর জবরদস্তি করে বিয়ে দিয়ে দিল। মাত্র ১৪ বছর বয়সে! একটি শিশু, যে নিজেই এখনো পুরোপুরি বড় হয়ে ওঠেনি, তাকে বানিয়ে দেওয়া হলো কারো ঘরের বউ।

“যে ধর্ম বা আদর্শ একটি শিশুর শৈশব চুরি করতে শেখায়, যে গোষ্ঠী একটি নাবালিকার শরীর ও মনকে জোরপূর্বক কোনো পুরুষের বিছানায় ঠেলে দিতে বাধ্য করে—তাকে আর যাই হোক, পবিত্র বা মানবিক বলা যায় না।”

একটি শরীর, দুটি প্রাণ এবং চরম নির্মমতা

১৪ বছরের লিসা বিয়ের ভয়াবহতা বোঝার আগেই তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো মাতৃত্বের চরম বোঝা। চিকিৎসাবিজ্ঞান চিৎকার করে বলে, এই বয়সে একটি মেয়ের শরীর সন্তান ধারণের জন্য উপযুক্ত নয়। কিন্তু মোল্লা সিকদার আমিনের মতো মৌলবাদীদের ফতোয়া আর অন্ধ অনুসারীদের কাছে বিজ্ঞানের চেয়ে নিজেদের কুসংস্কারের দাম অনেক বেশি।

ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। লিসা গর্ভবতী হলো। আর সেই অপরিপক্ক শরীরে একটি নতুন প্রাণ জন্ম দিতে গিয়ে লিসাকে নিজের জীবনটাই দিয়ে দিতে হলো। সন্তান প্রসবের তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে যখন লিসার প্রাণপাখি উড়ে গেল, তখন ওই মৌলবাদী সমাজ কি তাদের ভুল স্বীকার করেছে? তারা কি বুঝতে পেরেছে যে, লিসাকে কোনো নিয়তি মারেনি, মেরেছে তাদের ওই অন্ধকার চেতনা?

মৌলবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার: আর কত লিসা?

লিসার এই মৃত্যু আমাদের সমাজের মুখে এক তীব্র চড়। লিসার বাবার মতো যারা অন্ধ অনুসারী, যারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের কন্যাসন্তানদের স্রেফ একটি পণ্য বা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মনে করে, তাদের বিরুদ্ধে আজ রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।

ধর্মের নামে এই ব্যবসা বন্ধ হোক:

লিসার বাবা যার অনুসারী, সেই মোল্লা সিকদার আমিনদের মতো মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো সমাজে নারীদের কেবল অন্ধকারেই ঠেলে দিতে চায়। তারা চায় না মেয়েরা শিক্ষিত হোক, নিজেদের অধিকার বুঝুক।

বাল্যবিয়ে একটি অপরাধ:

আইন কাগজে-কলমে আছে, কিন্তু শ্রীকাইল গ্রামের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে মৌলবাদের দাপটে সেই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছে। লিসার পরিবার এবং এই বিয়ের সাথে জড়িত প্রতিটি মানুষকে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

সমাজকে জাগতে হবে:

আমরা আর কতকাল চুপ করে দেখব? আজ লিসা মরেছে, কাল হয়তো অন্য কোনো লিসা মরবে। ধর্মের দোহাই দিয়ে শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই অধিকার কাউকে দেওয়া যেতে পারে না।

শেষ কথা

লিসা আজ কবরে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। হয়তো এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর চেয়ে ওপারের জগৎটা তার জন্য অনেক বেশি নিরাপদ। কিন্তু আমাদের জবাব দিতে হবে। লিসার নিথর দেহটি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে গেছে—“আমার অপরাধ কী ছিল?”

আসুন, লিসার এই অকাল মৃত্যুকে স্রেফ একটা খবর হিসেবে ভুলে না যাই। এই মৌলবাদী শক্তি, এই ধর্মান্ধ সমাজ এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলি। বাংলার মাটিতে আর কোনো লিসাকে যেন ১৪ বছর বয়সে মা হতে গিয়ে কবরে যেতে না হয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *