ফতোয়ার শিকল ও মধ্যযুগীয় অন্ধকার: কুমিল্লা বিভাগের মুরাদনগরের মৌলবাদী আগ্রাসন এবং নাগরিক স্বাধীনতার সংকট

একটি আধুনিক, সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের শাসনই হলো নাগরিকের সুরক্ষার মূল ভিত্তি। রাষ্ট্র যেখানে সংবিধান এবং আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা, সেখানে যখন দেশের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে অসাংবিধানিক ফতোয়া এবং ধর্মীয় সামাজিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবন পরিচালনা করতে শুরু করে, তখন তা আধুনিক আইনব্যবস্থার মুখ থুবড়ে পড়ার স্পষ্ট সংকেত দেয়। বিশেষ করে কুমিল্লা বিভাগের মুরাদনগর অঞ্চলের মতো ঐতিহ্যবাহী এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় উস্কানিমূলক ঘটনা, বেআইনি সালিশি বৈঠক এবং ফতোয়াবাজির ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যখন কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী বা উগ্র সালিশদার নিজেদের আদালতের ঊর্ধ্বে মনে করে সামাজিক বয়কট, শারীরিক লাঞ্ছনা কিংবা ফতোয়া জারি করে কোনো নাগরিকের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে, তখন বুঝতে হবে সমাজে মৌলবাদের থাবা কতটা গভীরে বিস্তৃত হয়েছে। এই ধরনের বেআইনি ও বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ কেবল মানুষের মৌলিক মানবাধিকারই ক্ষুণ্ন করে না, বরং পুরো এলাকাকে এক মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

যেকোনো বিচারবহির্ভূত ফতোয়া বা সামাজিক বয়কটের প্রধান শিকার হন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, নারী, মুক্তচিন্তক কিংবা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। কুমিল্লা বিভাগের মুরাদনগরসহ বিভিন্ন মফস্বল এলাকায় দেখা যায়, ব্যক্তি আক্রোশ, প্রথাগত সংস্কার কিংবা ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ বা ‘সামাজিক অবক্ষয়’-এর মিথ্যা অজুহাত দাঁড় করানো হয়। এরপর তৈরি করা হয় ফতোয়ার ভয়ংকর ফাঁদ। কোনো যুক্তি বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বেআইনিভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা সরাসরি দেশের প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত বহু আগেই যেকোনো ধরনের ফতোয়া বা বিচারবহির্ভূত সামাজিক শাস্তি প্রদানকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সত্ত্বেও, মাঠপর্যায়ে যখন স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এসব ফতোয়াবাজ উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই বিচারহীনতার সুযোগে উগ্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের এলাকায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ভাবতে শুরু করে।

এই ফতোয়াবাজি ও মৌলবাদী আগ্রাসনের সামাজিক ও মানসিক প্রভাব মারাত্মক। এটি মানুষের স্বাধীন চিন্তা, প্রগতিশীল শিক্ষা এবং সুস্থ সামাজিক বিকাশের পথকে সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দেয়। যখন মুরাদনগরের মতো এলাকায় উগ্রবাদের তোপ থেকে সাধারণ মানুষ নিজেদের সুরক্ষিত মনে করে না, তখন সমাজে এক ধরনের স্থায়ী ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো সবসময়ই সাধারণ মানুষের অসচেতনতা এবং অন্ধ ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। এরা বৈজ্ঞানিক মানসিকতা, নারী অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ ভাবনার বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষবাষ্প ছড়ায়। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি এই অন্ধ প্রথা ও ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায়, তবে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা এসব ছোট ছোট উগ্রবাদী দুর্গ পরবর্তীতে পুরো দেশের শাসনব্যবস্থার জন্যই এক মহাবিপদ হিসেবে আবির্ভূত হবে।

ফতোয়া ও অন্ধ মৌলবাদের এই ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে প্রথমত রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। কুমিল্লা বিভাগের মুরাদনগরসহ দেশের যেকোনো প্রান্তে সংঘটিত বেআইনি ফতোয়া, সালিশি নির্যাতন বা সামাজিক বয়কটের সাথে জড়িত উগ্রপন্থীদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। একই সাথে প্রয়োজন শিক্ষার আলো বিস্তার ও প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলন। প্রথাগত কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিপরীতে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মানবাধিকার সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার অধিকারী এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিচারকের আসন দখল করে ফতোয়া জারি করার অধিকার রাখে না। একটি নিরাপদ, সভ্য ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে সব ধরণের বিচারবহির্ভূত ফতোয়াবাজি ও মৌলবাদী অপশক্তিকে শক্ত হাতে উপড়ে ফেলার কোনো বিকল্প নেই।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *