ক্যানসার যেমন মানবদেহে নীরবে ছড়িয়ে পড়ে সুস্থ কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়, ঠিক তেমনি আমাদের সমাজে ধর্মের পবিত্র মুখোশ পরে এক শ্রেণীর মৌলবাদী গোষ্ঠী সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছে। তারা ধর্মের মূল বাণী—শান্তি, মানবতা ও পরমতসহিষ্ণুতাকে আড়াল করে মানুষের মনে রোপণ করছে ঘৃণা, অন্ধত্ব আর আদিম মধ্যযুগীয় কুসংস্কার। এই মৌলবাদ আজ আমাদের সমাজের বুকে এক নীরব ও মারাত্মক ক্যানসার, যার সঠিক চিকিৎসা না হলে গোটা জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
ধর্ম মানুষের আত্মিক মুক্তির পথ দেখায়, কিন্তু মৌলবাদীরা সেই ধর্মকেই বানিয়েছে তাদের ক্ষমতার রাজনীতি, ব্যবসা আর আধিপত্য বিস্তারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তারা সাধারণ মানুষের সহজ-সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে। এদের মূল লক্ষ্যই হলো সমাজকে প্রগতির পথ থেকে টেনে পেছনে নিয়ে যাওয়া, মুক্তচিন্তার টুঁটি চেপে ধরা এবং মানুষকে বিজ্ঞানের চেয়ে অন্ধ ফতোয়ার দাস বানিয়ে রাখা।
যেখানে ক্যানসারের প্রথম আঘাত: নারী ও প্রগতি
এই মৌলবাদী ক্যানসার সবচেয়ে বড় আঘাতটি হানে আমাদের মা-বোনদের ওপর। ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে তারা নারীদের ঘরের চার দেয়ালে বন্দি রাখতে চায়, কেড়ে নিতে চায় তাদের শিক্ষার অধিকার। এমনকি লিসার মতো ১৪ বছরের অবুঝ শিশুদের জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে, প্রসবকালীন জটিলতায় যখন তাদের জীবন সংকটের মুখে পড়ে, তখনও ধর্মের দোহাই দিয়ে আধুনিক চিকিৎসা থেকে তাদের দূরে রাখা হয়।
“যে ফতোয়া একজন মুমূর্ষু মায়ের জীবন বাঁচাতে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে বাধা দেয়, তা কোনো ঐশ্বরিক বিধান নয়; তা হলো মৌলবাদের তৈরি করা এক ধরণের মানসিক বিকৃতি।”
বিজ্ঞান যখন প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনকে সহজ করছে, তখন এই মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো বিজ্ঞানকে ‘হারাম’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ বলে ফতোয়া জারি করে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা নিজেদের প্রচারের জন্য তারা ঠিকই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই দ্বিমুখী নীতিই প্রমাণ করে যে, তাদের উদ্দেশ্য ধর্ম রক্ষা করা নয়, বরং ধর্মের নামে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখা।
মুখোশ উন্মোচন ও আমাদের করণীয়
মৌলবাদীরা কখনো খোলা মাঠে নিজেদের হিংস্র রূপ নিয়ে আসে না; তারা আসে ধর্মের দরদী সেবক সেজে। এই মুখোশটা টেনে ছেঁড়ার সময় এখনই। সমাজকে এই মরণব্যাধি থেকে মুক্ত করতে হলে আমাদের কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে:
শিক্ষা ও মুক্তচিন্তার বিস্তার:
কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করার একমাত্র অস্ত্র হলো সঠিক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা। নতুন প্রজন্মকে এমন শিক্ষায় বড় করতে হবে যা তাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্ধভাবে কোনো ফতোয়াবাজকে অনুসরণ করতে নয়।
ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা:
যারা ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতি করে, ওয়াজ-মাহফিল বা ফতোয়ার নামে সমাজকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, তাদের শক্ত হাতে দমন করতে হবে।
আইনের কঠোর প্রয়োগ:
ধর্মের দোহাই দিয়ে যারা বাল্যবিয়ে দিচ্ছে, নারীদের চিকিৎসা বঞ্চিত করছে কিংবা সমাজে উগ্রবাদ ছড়াচ্ছে—তাদের চিহ্নিত করে রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
শেষ কথা
কোনো সমাজ ক্যানসার আক্রান্ত শরীর নিয়ে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। মৌলবাদের এই নীরব ক্যানসার যদি আমরা এখনই উপড়ে ফেলতে না পারি, তবে আমাদের সব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়বে।
ধর্ম হোক মানুষের অন্তরের বিশ্বাস ও শান্তির উৎস, তা যেন কোনোভাবেই মৌলবাদীদের হিংস্র থাবা এবং শোষণের অস্ত্র না হয়ে ওঠে। আসুন, ধর্মের মুখোশ পরা এই ছদ্মবেশী শত্রুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলি এবং সমাজকে এক মুক্ত, প্রগতিশীল ও মানবিক বাসভূমিতে পরিণত করি।