ফতোয়া যখন চিকিৎসার পথে দেয়াল

আজকের যুগে এসেও আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর মানসিকতা কাজ করে। কিছু মানুষের কাছে একজন নারীর “তথাকথিত পর্দা রক্ষা করা” তার আস্ত একটা জীবনের চেয়েও বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা আর ফতোয়াবাজির অন্ধকার দেয়ালে আটকে গিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের মা-বোনদের জীবনকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে চরম ঝুঁকির মুখে।

একজন গর্ভবতী নারীর যখন প্রসবকালীন তীব্র জটিলতা তৈরি হয়, যখন সেকেন্ডের ব্যবধানে তার ও তার অনাগত সন্তানের জীবনপ্রদীপ নিভে যেতে পারে—ঠিক সেই মুহূর্তেও এক শ্রেণীর ফতোয়াবাজ পরিবারে ডাক্তার খোঁজা হয় লিঙ্গ দেখে, যোগ্যতা দেখে নয়। “পুরুষ ডাক্তার কেন নারীর শরীর স্পর্শ করবে?”—এই ঠুনকো গোঁড়ামির দোহাই দিয়ে মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে ঘরে ফেলে রাখা হয়, কিংবা হাতুড়ে ডাক্তারের হাতে সঁপে দেওয়া হয়।

ভাবা যায়, জীবনের চেয়ে পর্দা রক্ষা করাকে এখানে বেশি অগ্রাধিকার (priority) দেওয়া হচ্ছে! অথচ পৃথিবীর কোনো মানবিক ধর্মই মানুষের জীবনের চেয়ে নিয়ম-কানুনকে বড় করে দেখায়নি। ইসলামের বিধান অনুযায়ীও, আপৎকালীন বা জরুরি মুহূর্তে জীবন বাঁচানোর তাগিদে যেকোনো সাধারণ নিয়মের শিথিলতা স্পষ্টভাবেই অনুমোদিত। তাহলে কোন যুক্তিতে একজন মুমূর্ষু মাকে পুরুষ ডাক্তারের কাছে যেতে বাধা দেওয়া হয়? এটা কি ধর্মভীতি, নাকি ধর্মের নামে স্রেফ এক ধরণের অন্ধ মৌলবাদী জেদ?

যে পর্দা প্রথার ভুল ব্যাখ্যা একজন নারীর সুচিকিৎসার অধিকার কেড়ে নেয়, তাকে বাঁচানোর বৈজ্ঞানিক পথটা বন্ধ করে দেয়, তা আসলে কোনো ধর্মীয় অনুশাসন নয়; তা হলো মৌলবাদের চাপিয়ে দেওয়া এক ধরণের মানসিক দাসত্ব। একজন মা বা একজন নারী প্রথমে একজন মানুষ। তার বেঁচে থাকার অধিকার, সুস্থ থাকার অধিকার সবার ওপরে।

আসুন, ধর্মের এই অপব্যাখ্যা ও ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়াই। অন্ধত্বের দেয়াল ভেঙে সমাজকে পরিষ্কার বার্তা দিই—কুসংস্কারের বলি বানিয়ে আর কোনো নারীর জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে দেওয়া হবে না। মানুষের জীবনই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *