​”রাষ্ট্রের নাগরিক বনাম প্রান্তিক সত্তা: বাংলাদেশের সংবিধানে বৈষম্যহীনতার অধিকার এবং এলজিবিটিকিউ+ সমাজ”

একটি গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের প্রতিশ্রুতি বুকে নিয়ে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” ২৮ অনুচ্ছেদে আরও সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। কিন্তু সংবিধানের এই মহৎ ও সর্বজনীন ভাষার আড়ালে যখন আমরা আমাদের সমাজের লিঙ্গীয় ও যৌন বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী বা এলজিবিটিকিউ+ (LGBTQ+) সমাজের বাস্তবতার দিকে তাকাই, তখন ‘নাগরিক’ এবং ‘প্রান্তিক সত্তা’র মধ্যকার এক গভীর ও বেদনাদায়ক ফাটল দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ও সংবিধান যেখানে বৈষম্যহীনতার অধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেখানে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রতিদিন তাদের অস্তিত্ব, পরিচয় এবং বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য এক অদৃশ্য দেয়ালের মুখোমুখি হচ্ছে।বাংলাদেশের সংবিধানে “নারী-পুরুষভেদে” বৈষম্য না করার কথা বলা হলেও সেখানে কেবল প্রথাগত দ্বিমাত্রিক লিঙ্গ পরিচয়কেই অবচেতনভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যারা এই চিরাচরিত কাঠামোর বাইরে—যেমন হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডার, সমকামী বা উভকামী ব্যক্তিবর্গ—তারা সাংবিধানিক সুরক্ষার এক বিশাল ধূসর এলাকায় পতিত হন। রাষ্ট্র ২০১৪ সালে ‘হিজড়া’ জনগোষ্ঠীকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছিল, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই স্বীকৃতির পর এক দশক পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বিশাল ঘাটতি। উপরন্তু, হিজড়া সংস্কৃতির বাইরে যে বিশাল লিঙ্গীয় ও যৌন বৈচিত্র্যময় সমাজ রয়েছে, তাদের আইনি বা সামাজিক স্বীকৃতি আজও অধরা। ফলে, সংবিধানে বর্ণিত “আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার” এই প্রান্তিক সত্তাগুলোর জন্য কেবলই কাগজের শব্দে পরিণত হয়েছে।এলজিবিটিকিউ+ সমাজের নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার অন্যতম বড় আইনি বাধা হলো ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক আইন ‘দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা’। এই প্রাচীন আইনটি কেবল একটি বিশেষ যৌন আচরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না, বরং এটি পুরো জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে অপরাধী বা ‘ক্রিমিনালাইজ’ করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই আইনের অস্তিত্বের কারণে একজন নাগরিক তার নিজের ঘরেও সুরক্ষিত বোধ করেন না। এটি তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে লুণ্ঠন করে, যা সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) পরিপন্থী। এই আইনি মারপ্যাঁচের সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রভাবশালী অংশ এই জনগোষ্ঠীর ওপর মানসিক ও শারীরিক সহিংসতা চালানোর এক অলিখিত লাইসেন্স পেয়ে যায়।আইনি সুরক্ষার এই অনুপস্থিতি এলজিবিটিকিউ+ সমাজকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা এবং আবাসনসহ জীবনের প্রতিটি মৌলিক ক্ষেত্রে চরমভাবে প্রান্তিক করে তোলে। একজন ট্রান্সজেন্ডার বা সমকামী ব্যক্তি যখন তার আত্মপরিচয় প্রকাশ করেন বা প্রকাশ পেয়ে যায়, তখন পরিবার থেকেই শুরু হয় প্রথম সহিংসতা। সমাজ ও পরিবার তাদের ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অসুস্থ’ তকমা দিয়ে একঘরে করে দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরম বুলিং ও হেনস্তার শিকার হয়ে অনেক তরুণ অকালেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কর্মক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে চাকরি দেওয়া হয় না, অথবা কর্মপরিবেশকে এতটাই বিষাক্ত করে তোলা হয় যে তারা স্বকাজে টিকে থাকতে পারেন না। এমনকি অসুস্থ হলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েও তাদের উপহাস ও মর্যাদাহানির শিকার হতে হয়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও নিজের পরিচয়ের কারণে নিজের দেশে ঘর ভাড়া না পাওয়া বা কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হওয়া চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রান্তিক সত্তাগুলোর সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে দেশের মৌলবাদী ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের কারণে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং প্রকাশ্য ওয়াজ-মাহফিলগুলোতে এলজিবিটিকিউ+ অধিকার বা লিঙ্গ বৈচিত্র্যের ধারণাকে “পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি” বা “ধর্মবিরোধী” আখ্যা দিয়ে তীব্র ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকারের সামান্যতম অন্তর্ভুক্তিকেও কেন্দ্র করে দেশজুড়ে উগ্র উন্মাদনা তৈরি করা হয়েছে। এই ঘৃণাত্মক বক্তব্য বা ‘হেট স্পিচ’ কেবল মৌখিক বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না, তা অনেক সময় প্রত্যক্ষ শারীরিক আক্রমণ ও জীবনের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর এই মব কালচার বা জনরোষের ভয়ে প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ এবং খোদ ভুক্তভোগীরা নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। রাষ্ট্র যেখানে উগ্রবাদীদের দমনে কঠোর হওয়ার কথা, সেখানে অনেক সময় জনতুষ্টির রাজনীতি বা কৌশলগত কারণে এই প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষার চেয়ে রক্ষণশীলদের দাবির মুখে নতি স্বীকার করতে দেখা যায়, যা তাদের নাগরিক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।অথচ, মানবাধিকারের ধারণা কোনো ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক সীমানায় আবদ্ধ নয়। এলজিবিটিকিউ+ ব্যক্তিরা এই মাটিরই সন্তান, এ দেশেরই করদাতা এবং এ দেশেরই নাগরিক। তাদের অধিকার কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নয়, বরং তা একজন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার। সংবিধানে বৈষম্যহীনতার যে মহান দর্শন রয়েছে, তাকে পূর্ণতা দিতে হলে রাষ্ট্রকে তার রক্ষণশীলতার খোলস থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ৩৭৭ ধারার মতো ঔপনিবেশিক বৈষম্যমূলক আইনের সংস্কার, কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য কোটা বা বিশেষ সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন এবং লিঙ্গ বৈচিত্র্য সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। যতক্ষণ না পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রান্তিকতম সত্তাটি তার লিঙ্গীয় বা যৌন পরিচয়ের ভয় ছাড়াই পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা নিয়ে বুক ফুলিয়ে বাঁচতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সাংবিধানিক বৈষম্যহীনতার দাবি আংশিক এবং অপূর্ণই থেকে যাবে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই প্রান্তিক সমাজকে পেছনে ফেলে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *