ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ‘গুজব’ ও হামলা

বাংলাদেশী সমাজের চিরন্তন অহংকার ছিল এর অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং আবহমানকালের ধর্মীয় সম্প্রীতি। কিন্তু গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে, এই সম্প্রীতির গায়ে বারবার কুঠারাঘাত করা হচ্ছে একটি সুনির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত চতুর হাতিয়ার দিয়ে— যার নাম “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের গুজব”। ডিজিটাল যুগের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর মৌলবাদী ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে, ফেসবুকের একটি লাইক, কমেন্ট বা স্ক্রিনশটকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে উঠছে আস্ত একটা গ্রাম বা সংখ্যালঘু পাড়া।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা আকস্মিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে একটি সুপরিস্থত অপরাধমূলক ব্লুপ্রিন্ট এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতি।

ডিজিটাল ব্লুপ্রিন্ট: যেভাবে ছড়ায় আগুন

এই ধরণের প্রতিটি হামলার মোডাস অপারেন্ডি বা অপরাধের ধরণ বিশ্লেষণ করলে একটি অভিন্ন ছক বা স্ক্রিপ্ট চোখে পড়ে:

প্রথম ধাপ: কোনো একজন সংখ্যালঘু ব্যক্তি বা ভিন্নমতাবলম্বীর নামে একটি ফেক প্রোফাইল তৈরি করা হয়, অথবা তার আসল আইডিটি হ্যাক করা হয়।

দ্বিতীয় ধাপ: সেই আইডি থেকে ইসলাম ধর্ম বা ধর্মীয় কোনো প্রতীককে অবমাননা করে পোস্ট বা এডিটেড ছবি আপলোড করা হয়। বর্তমান সময়ে এর সাথে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI, যার মাধ্যমে নিখুঁত “ডিপফেক” অডিও-ভিডিও তৈরি করে নিখুঁত প্রমাণের ফাঁদ পাতা হচ্ছে।

তৃতীয় ধাপ: উগ্রপন্থী কিছু পেজ বা লোকাল গ্রুপ থেকে সেই পোস্টের স্ক্রিনশট ভাইরাল করা হয় এবং ধর্মীয় উসকানি দিয়ে মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানানো হয়।

চতুর্থ ধাপ: স্থানীয় মসজিদের মাইক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইভ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় একটি উগ্র জনতা বা ‘মব’ (Mob)। এরপর শুরু হয় আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বাড়িঘর, উপাসনালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের তণ্ডবলীলা।

অন্ধ আবেগের আড়ালে বস্তুগত ফায়দা

বাইরে থেকে একে কেবলই “ধর্মীয় অনুভূতির রক্ষা” বলে চালিয়ে দেওয়া হলেও, এর গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় নির্মম সত্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই গুজবের পেছনে কাজ করে নিরেট ইহজাগতিক ও বস্তুগত লোভ:

ভূমি ও সম্পত্তি গ্রাস: গ্রামীণ বা মফস্বল এলাকার সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর জমিজমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তাদের সামাজিকভাবে একঘরে বা এলাকাছাড়া করা। এই গুজব সেই সুযোগটি এনে দেয়।

রাজনৈতিক আধিপত্য: স্থানীয় নির্বাচন বা রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মেটাতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা গোটা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে এই সাম্প্রদায়িক কার্ড অত্যন্ত কার্যকর।

মনস্তাত্ত্বিক মেরুকরণ: সমাজকে উগ্র এবং অনুগ্র— এই দুই ভাগে ভাগ করে যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল কণ্ঠস্বরগুলোকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া এই গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

মব জাস্টিস’ এবং আইনের অসহায়ত্ব

এই প্রবণতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো “মব জাস্টিস” বা গণ-আদালতের সংস্কৃতি। উত্তেজিত জনতা কোনো সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ দেয় না, রাষ্ট্রীয় আইন বা আদালতের তোয়াক্কা করে না। তারা নিজেরাই পুলিশ, নিজেরাই বিচারক এবং নিজেরাই জল্লাদ বনে যায়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি সামলাতে বা বড় ধরনের সহিংসতা এড়াতে আপসমূলক নীতি গ্রহণ করে। যার আইডি হ্যাক হয়েছে বা যে আসলেই নির্দোষ, তাকেই জনরোষ থেকে বাঁচাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা বা সাইবার আইনের আওতায় গ্রেফতার করা হয়। অপরাধী না হয়েও ভুক্তভোগী নিজেই বলির পাঁঠা বনে যান, আর মূল গুজব রটনাকারীরা পর্দার আড়ালে থেকে যায় অক্ষত।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি: অপরাধের পুনরাবৃত্তির জ্বালানি

আমরা যদি রামু, নাসিরনগর, শাল্লা, নড়াইল বা সাম্প্রতিক মাসগুলোর ঘটনাগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখব ঘটনার পর মামলা হয়, কিছু গ্রেফতারও হয়; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মূল পরিকল্পনাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাওয়ার নজির মেলা ভার। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের মনে এই বার্তা দেয় যে, “ধর্মের দোহাই দিয়ে যেকোনো অপরাধ পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব।” এই দায়হীনতাই নতুন আরেকটি গুজব ছড়ানোর সাহস জোগায়।

আমাদের করণীয়: দেয়াল তোলার সময় এখনই

এই অন্ধত্ব এবং ঘৃণার সংস্কৃতি যদি রুখে দেওয়া না যায়, তবে কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ টেকসই হতে পারে না। এই সংকট থেকে উত্তরণে তিনটি স্তরে কাজ করা জরুরি:

ব্যক্তিগত স্তরে ‘ফ্যাক্ট-চেক’ কালচার: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো সংবেদনশীল বা উসকানিমূলক পোস্ট দেখামাত্রই তা বিশ্বাস না করে সত্যতা যাচাইয়ের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। “শেয়ার” বা “রিয়েক্ট” করার আগে ভাবতে হবে, আমি কোনো গুজবের অংশ হচ্ছি না তো?

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: রাষ্ট্রের সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে আরও আধুনিক ও দ্রুতগতির হতে হবে, যাতে গুজব ছড়ানোর প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই মূল অপরাধীকে শনাক্ত করে সত্যটা জনগণের সামনে প্রকাশ করা যায়।

আইনের কঠোর প্রয়োগ: মব কালচারের সাথে জড়িত এবং পর্দার আড়ালের উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *