একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আইনের শাসনকে সর্বজনীনভাবে বজায় রাখা। কোনো একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সরকারের সূচনা পর্ব, বিশেষ করে প্রথম ১০০ দিন, দেশের সার্বিক সামাজিক ও প্রশাসনিক গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই প্রাথমিক সময়টিতেই যখন দেশে অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা এবং বিপুল প্রাণহানির মতো ঘটনা নিয়মিত খবরের শিরোনাম হতে শুরু করে, তখন তা নাগরিক মনে গভীর উৎকণ্ঠা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬ শতাধিক অর্থাৎ প্রায় ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এর পাশাপাশি একাধিক অপহরণ, গোলযোগ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো আশঙ্কজনক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। এই পরিসংখ্যান কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের কান্না, হাহাকার এবং নিরাপত্তাহীনতার এক বিশাল অন্ধকার। যখন এই ধরণের প্রাণহানির মতো ঘটনা নিয়মিত চিত্র হয়ে ওঠে, তখন গভীরভাবে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন পড়ে যে, এই চরম সামাজিক ও প্রশাসনিক বিপর্যয়ের পেছনে কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতাই দায়ী, নাকি এর শেকড় আরও গভীরে—উগ্র মৌলবাদী মনস্তত্ত্ব ও অন্ধ চেতনার প্রসারের মধ্যে নিহিত।
ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, যখনই একটি দেশের আইনি কাঠামো ও আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ তাদের কার্যকারিতা বা পেশাদারত্ব বজায় রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, ঠিক তখনই উগ্রপন্থী ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীগুলো সেই শূন্যতার সুযোগ নেয়। ধর্মীয় উগ্রতা ও গোঁড়ামির মূল বৈশিষ্ট্যই হলো যুক্তি, মানবিকতা, বিচারব্যবস্থা এবং মুক্তচিন্তার প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করা। উগ্রবাদী মানসিকতা মানুষকে পরমতসহিষ্ণু হতে শেখায় না; বরং যেকোনো ভিন্নমত, ভিন্নচিন্তা বা ভিন্ন জীবনধারাকে জোরপূর্বক দমন করতে সহিংসতাকে একটি প্রধান পথ হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহিত করে। যখন সমাজে ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনীতিকরণ বা ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন তা কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় না, বরং গোটা সমাজব্যবস্থায় এক ধরনের চরমপন্থী উস্কানি ও বিচারহীনতার পরিবেশ তৈরি করে। টিআইবির গবেষণায় উঠে আসা শত শত প্রাণহানি ও সহিংসতার পেছনের সামাজিক কারণগুলো অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় উগ্রতার আস্ফালন কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অকার্যকর করে তোলে। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো সবসময়ই সাধারণ মানুষের ভয়, সংশয় ও ধর্মীয় আবেগকে মূলধন করে তাদের অন্ধ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় সাধারণ নাগরিকের অকাল মৃত্যু ও অধিকার হরণ।
রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা যদি যেকোনো ধরনের চরমপন্থা ও ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেখানে নাগরিক সুরক্ষা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। উগ্রবাদী ভাবধারা এবং অন্ধ মানসিকতা সমাজের মৌলিক বিবেক ও মানবিক মূল্যবোধকে বিনষ্ট করে ফেলে। যখন ধর্মের নামে বা ধর্মীয় আবেগের অজুহাতে যেকোনো সহিংসতাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বা বিচার না করে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এক অজানা আতঙ্কের মধ্যে দিনপাত করে এবং রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি অর্থাৎ ‘আইনের চোখে সবাই সমান’—এই ধারণাটি পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। টিআইবি বা অন্যান্য নিরপেক্ষ মাধ্যমে প্রকাশিত এই রক্তক্ষয়ী পরিসংখ্যান আসলে আমাদের সচেতন সমাজ ও মুক্তচিন্তকদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। এটি প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও উগ্রবাদের কাছে যদি রাষ্ট্রে আইনের শাসন নতিস্বীকার করে, তবে সেই সমাজে কখনোই স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা বা প্রগতি আসতে পারে না।
এই অন্ধকার ও সহিংসতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই একযোগে কাজ করতে হবে। ধর্মীয় উগ্রতা, সামাজিক বিভাজন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ও অদম্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে প্রগতিশীল চিন্তাধারা, মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ এবং বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনে জোর দিতে হবে, যা অন্ধ উগ্রবাদের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিতে পারে। কোনো একটি রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না যদি না সেখানে নাগরিকের মৌলিক সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত হয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটে। ধর্ম বা মতাদর্শের অজুহাতে সংঘটিত সকল প্রকার রক্তপাতকে শক্ত হাতে দমন করাই হলো একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজের একমাত্র পরিচয়। রাষ্ট্রকে অবশ্যই এই চরমপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, যাতে কোনো অন্ধ গোষ্ঠী আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়ার দুঃসাহস না পায় এবং প্রতিটি নাগরিক তার জীবন ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে।