সমকামীদের অধিকার—এটা কোনো বিতর্কের বিষয়ই নয়; এটা মানবাধিকার। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কাকে ভালোবাসবে, কার সঙ্গে জীবন কাটাবে—এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু ঠিক এখানেই মৌলবাদীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো: অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তাদের এত ভয়, এত রাগ, এত বিদ্বেষ কেন?
১. বিজ্ঞানের সরাসরি বিরোধিতা করে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চায় মৌলবাদীরা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৯০ সালেই সমকামিতাকে “মনোরোগ” তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) দশকের পর দশক ধরে বলছে—যৌন ঝোঁক জন্মগত বা স্বাভাবিক বৈচিত্র্য।
কিন্তু মৌলবাদীরা এসব তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করে। কেন?
কারণ সত্য তথ্য গ্রহণ করলে তাদের প্রোপাগান্ডা ধ্বসে পড়ে।
বিজ্ঞান বলে—“এটা স্বাভাবিক।”
মৌলবাদীরা চায় মানুষ ভাবুক—“এটা শয়তানি।”
তথ্য আর অজ্ঞতার মাঝে যুদ্ধ হলে অজ্ঞতার বিজয় হয় না—তাই তারা ভয় পায়।
২. ইতিহাস-সংস্কৃতির প্রমাণও তাদের বিব্রত করে
ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিতেই সমলিঙ্গ প্রেম হাজার বছরের অংশ।
— মনুসংহিতা-তে সমলিঙ্গ সম্পর্কের আলোচনা আছে।
— কামসূত্র-এ সমলিঙ্গ ভালোবাসা নিয়ে পর্যাপ্ত বর্ণনা আছে।
— খাজুরাহো মন্দিরের ভাস্কর্যেও সমলিঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত।
অর্থাৎ, সমকামীদের অস্তিত্ব “পশ্চিমা ষড়যন্ত্র” নয়—বরং উপমহাদেশের নিজস্ব ইতিহাসেরই অংশ।
এই সত্যগুলো মৌলবাদীদের জন্য অস্বস্তিকর, তাই তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়।
৩. ঘৃণা ছাড়া তাদের রাজনীতি চলে না—সেজন্য নতুন ‘শত্রু’ দরকার
মৌলবাদী রাজনীতির মূল জ্বালানি হলো ভয় ও ঘৃণা।
কখনো নারীকে টার্গেট, কখনো লেখককে টার্গেট, কখনো সংখ্যালঘুকে।
এবার শিকার সমকামী মানুষ।
কারণ “শত্রুর” অস্তিত্ব ছাড়া মৌলবাদীরা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
যখন তারা বলে—
“সমাজ নষ্ট হচ্ছে”—এই মিথ্যায় মানুষ আবেগতাড়িত হয়, যুক্তি হারিয়ে ফেলে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—সমকামী দু’জন মানুষ একসঙ্গে থাকলে সমাজের কারও কোনো ক্ষতি হয় না।
সমাজ নষ্ট হয় তখনই—
যখন কেউ অন্যকে মারার ডাক দেয়, যখন ঘৃণা প্রজন্মে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
৪. ব্যক্তিস্বাধীনতা মৌলবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু
সমকামীদের অধিকার স্বীকৃত হলে সমাজ একটি বার্তা পায়—
“মানুষ তার জীবন নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার রাখে।”
এই বার্তা মৌলবাদী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেয়।
তারা চায়:
— পোশাক তারা নির্ধারণ করবে
— প্রেম-সম্পর্ক তারা নির্ধারণ করবে
— নারীর চলাফেরা তারা নির্ধারণ করবে
— কার ধর্মীয় ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য, সেটাও তারা ঠিক করবে
— এক কথায়, মানুষের জীবন তারা পরিচালনা করবে
কিন্তু সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা মানে হলো মানুষের শরীর, মনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানো।
৫. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডও তাদের পছন্দ নয়
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা (UNHRC) স্পষ্ট বলেছে—LGBTQ মানুষের অধিকার হলো অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার।
বাংলাদেশও একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির অংশ, যেখানে “যৌন ঝোঁকের ভিত্তিতে বৈষম্য” নিষিদ্ধ।
কিন্তু মৌলবাদীরা চায় রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মেনে ধর্মের নামে নিপীড়ন বৈধ করুক।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণাই তাদের জন্য ভয়ংকর।
৬. সমকামী বিরোধিতা হলো আসলে আধুনিকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ
মানুষ যতই শিক্ষিত হবে, যতই তথ্য পাবে, যতই মানবাধিকার বুঝবে—
মৌলবাদের জায়গা ততই সংকুচিত হবে।
তাই তারা সমকামী মানুষকে টার্গেট করে:
এটা তাদের শেষ শক্ত ঘাঁটি—ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ।
কিন্তু সত্য একটাই:
সমকামী অধিকার মানে কাউকে কিছু কেড়ে নেওয়া নয়; বরং সবাইকে সমান মর্যাদা দেওয়া।
মৌলবাদীরা যতই চিৎকার করুক, ঘৃণার রাজনীতি যতই চালাক, ইতিহাস বলে—
মানবাধিকার শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করে।
ভালোবাসাকে হত্যা করা যায় না; ভয় দেখিয়ে নিস্তব্ধ করা যায় না।
যারা হত্যা, হুমকি, সহিংসতার কথা বলে—
তারা সমাজকে রক্ষা করে না, তারা সমাজকেই বিপন্ন করে।