একটি প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার টিকে থাকা নির্ভর করে তার মফস্বল অঞ্চলগুলোর সামাজিক সম্প্রীতি, সর্বজনীন নাগরিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় প্রশাসন ও আইনি কাঠামোর নিরপেক্ষতার ওপর। কিন্তু যখন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল—যেমন কুমিল্লার চান্দিনা—রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির অভাব কিংবা ধর্মীয় তোষণনীতির কারণে উগ্র মৌলবাদী ভাবধারার উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়, তখন তা কেবল একটি এলাকার শান্ত পরিবেশকেই বিঘ্নিত করে না, বরং পুরো দেশের সামাজিক বুননকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিকভাবে কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল যেমন শিক্ষা, কৃষি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ে চান্দিনাসহ বিভিন্ন মফস্বল এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় ধর্মীয় ওয়াজ-মাহফিলকে কেন্দ্র করে যে একমুখী উগ্র ভাবাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা গভীর চিন্তার বিষয়। যখন ধর্মীয় গোঁড়ামিকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্যহীনতা, উগ্রতা এবং বিচারবহির্ভূত সামাজিক চাপ তৈরির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, তখন সেখানে সাধারণ নাগরিক, মুক্তচিন্তক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে শুরু করে।
যেকোনো এলাকায় মৌলবাদের উত্থান হঠাৎ করে ঘটে না; এটি একটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। কুমিল্লার চান্দিনার মতো এলাকাগুলোতে যখন স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উগ্রবাদী গোষ্ঠীর বিভিন্ন অপতৎপরতা কিংবা প্রথাভাঙ্গা চিন্তার প্রতি তাদের উস্কানিমূলক মনস্তত্ত্বকে শক্ত হাতে দমন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই শূন্যতার সুযোগ নেয় ধর্মান্ধ গোষ্ঠীগুলো। এরা কেবল ধর্মীয় উপদেশ বা বিশ্বাসের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং বিচারব্যবস্থা, সামাজিক আচার, শিক্ষার পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর নিজেদের তৈরি কঠোর নিয়মকানুনের অন্যায্য প্রয়োগ ঘটাতে চায়। কোনো আধুনিক রাষ্ট্রে যখন স্থানীয় পর্যায়ে আইনের সুশাসন শিথিল হয়ে পড়ে, তখন এ ধরনের উগ্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের ‘সামাজিক বিচারক’ বা ‘ধর্মীয় রক্ষক’ হিসেবে উপস্থাপন করার সাহস পায়। টিআইবি-সহ বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার পরিসংখ্যানে যেসব অপরাধ, সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার চিত্র উঠে আসে, তার পেছনে এই ধরনের আঞ্চলিক পর্যায়ে গড়ে ওঠা উগ্র ও ধর্মান্ধ মনস্তত্ত্বের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
উগ্র মৌলবাদী ভাবধারার সবচেয়ে বড় শিকার হয় সমাজের মুক্তচিন্তা, নারীর অগ্রগতি, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং মানবিক সহনশীলতা। চান্দিনার মতো মফস্বল এলাকাগুলোতে যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনের বড় অংশ জুড়ে থাকে প্রথাগত সামাজিক মূল্যবোধ, সেখানে উগ্র গোষ্ঠীগুলো উস্কানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা এবং সামাজিক বৈচিত্র্যের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। এরা মানুষকে বৈজ্ঞানিক যুক্তি বা মুক্তচিন্তার বদলে অন্ধ আনুগত্য এবং উগ্রতার দিকে ধাবিত করে। যখন রাষ্ট্রীয় বা স্থানীয় প্রশাসন ধর্মীয় উগ্রতাকে তোষণ করে সিদ্ধান্ত নেয় বা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করে, তখন সাধারণ মানুষের মনে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি তৈরি হয়। বিচারহীনতার এই সুযোগ নিয়ে ধর্মান্ধরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং আইনকে নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়, যা যেকোনো সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজের জন্য এক বড় ধরনের কলঙ্ক।
কুমিল্লার চান্দিনাসহ দেশের যেকোনো প্রান্তকে উগ্র মৌলবাদের ভয়াবহ থাবা থেকে মুক্ত করতে হলে প্রথমত কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। আইনকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা অন্ধ বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে রেখে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে কোনো উগ্র গোষ্ঠী ধর্মীয় বা সামাজিক অজুহাতে সহিংসতা ছড়ানোর সাহস না পায়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন একটি সচেতন, যুক্তিভিত্তিক ও প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলন। মফস্বল অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এই অন্ধকারের একমাত্র উপযুক্ত জবাব হতে পারে যুক্তি, বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সর্বজনীন মানবাধিকারের সঠিক চর্চা। রাষ্ট্রকে অনুধাবন করতে হবে যে, প্রতিটি অঞ্চলে আইনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং উগ্র ভাবাদর্শকে প্রশাসনিক ও সামাজিকভাবে দমন করা না গেলে, একটি আধুনিক ও নিরাপদ সমাজ গঠনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।