মানব সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো—সে তার সবচেয়ে প্রান্তিক ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে কতটা মর্যাদা এবং নিরাপত্তা দিতে পারছে। একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার, ভালোবাসার এবং নিজস্বidentity বা পরিচয় বজায় রাখার অধিকার রয়েছে। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে আমাদের দক্ষিণ এশীয় সমাজে, লিঙ্গীয় ও যৌন বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী বা সমকামী সমাজকে এক গভীর অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সমকামিতার অধিকারকে প্রায়শই এক ধরনের ‘বিশেষ সুবিধা’ (privilege) বা কোনো ‘বিলাসিতা’ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। অথচ, একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো বাড়তি সুযোগের দাবি নয়; বরং এটি একজন মানুষের জন্মগত ও মৌলিক মানবাধিকারের অংশ।
প্রথমেই যে বিষয়টি বোঝা প্রয়োজন তা হলো, ভিন্নতা কোনো অপরাধ বা অসুস্থতা নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে যে, মানুষের যৌন অভিযোজন বা sexual orientation কোনো চয়েস বা শখ নয়, বরং এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক গঠনের একটি স্বাভাবিক বৈচিত্র্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ১৯৯০ সালেই সমকামিতাকে মানসিক ব্যাধির তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। প্রকৃতিতে যেমন নানা রঙের ফুল ও বৈচিত্র্য থাকে, মানুষের অনুভূতি এবং ভালোবাসার জগতেও তেমন বৈচিত্র্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সমাজ প্রথাগত দ্বিমাত্রিক (heteronormative) কাঠামোর বাইরে যেকোনো কিছুকেই ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করতে অভ্যস্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই একজন মানুষকে কেবল তার সহজাত অনুভূতির জন্য আজীবন অপরাধবোধ ও সামাজিক লজ্জার বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়।
অধিকারের প্রশ্নে আসলে দেখা যায়, সমকামী ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের কাছে কোনো বিশেষ কোটা বা অলৌকিক ক্ষমতা দাবি করছেন না। তারা কেবল একজন সাধারণ নাগরিকের মতো সমান অধিকার চান। সংবিধানে যেখানে বলা হয়েছে যে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান এবং রাষ্ট্র কারও প্রতি বৈষম্য করবে না, সেখানে কেবল যৌন পরিচয়ের কারণে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা স্পষ্ট বৈষম্য। একজন সমকামী মানুষ যখন চাকরি পান না, পরিবার থেকে বিতাড়িত হন, হাসপাতালে বৈষম্যের শিকার হন কিংবা নিজের ঘরেও রাষ্ট্র বা সমাজের ভয়ে আইনি সুরক্ষাহীনতায় ভোগেন—তখন তা আর কেবল কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর ব্যর্থতা।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এই অধিকার হরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ঔপনিবেশিক আমলের প্রাচীন আইন, যেমন দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা। ব্রিটিশ শাসকেরা নিজেদের ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা চাপিয়ে দিতে যে আইন তৈরি করেছিল, তা স্বাধীন রাষ্ট্রে আজও বহাল থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই আইন কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতার অধিকারকেই খর্ব করে না, বরং উগ্র ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোকে এই প্রান্তিক মানুষের ওপর সহিংসতা ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য (hate speech) ছড়ানোর সামাজিক লাইসেন্স দেয়। অথচ, মানবাধিকারের মূল কথাই হলো ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মর্যাদার সুরক্ষা, যা কোনো সংখ্যাগুরু সমাজের তৈরি করা সামাজিক ফতোয়া বা রক্ষণশীলতার অধীন হতে পারে না।
ভালোবাসা এবং সহমর্মিতা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় বা প্রথায় বন্দি নয়। কাউকে ভালোবেসে বা নিজের সত্য পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য কাউকে যদি রাষ্ট্র বা সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়, তবে সেই সমাজকে কখনো সভ্য বলা চলে না। সমকামী অধিকারের লড়াইটি আসলে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থের লড়াই নয়, এটি মানুষের চিন্তার মুক্তি এবং মৌলিক স্বাধীনতার লড়াই। যতদিন না আমরা মানুষের ভিন্নতাকে মেনে নিতে শিখব এবং ঘৃণার বদলে সহনশীলতার সমাজ গড়তে পারব, ততদিন আমাদের সাম্য ও মানবাধিকারের দাবি অপূর্ণই থেকে যাবে। অন্ধকার কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই হোক একটি আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য।