অন্ধত্বের খাচায় বন্দি বিচারব্যবস্থা

আইনের চোখে চোখ বাঁধা দেবীর মূর্তিটি হলো নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার এবং সমতার প্রতীক। এর অর্থ হলো, বিচারক অপরাধীকে কিংবা বাদীর পরিচয় না দেখে কেবল প্রমাণ ও সংবিধানের আলোর ভিত্তিতে রায় দেবেন। কিন্তু আমাদের বাস্তব সমাজে যখন বিচারব্যবস্থা অন্ধত্ব, কূপমণ্ডূকতা এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করে, তখন সেই প্রতীকী অন্ধত্ব এক ভয়ানক বঞ্চনার খাঁচায় পরিণত হয়। অন্ধত্ব যখন সততার বদলে অজ্ঞতা ও পক্ষপাতে রূপ নেয়, তখন ন্যায়বিচার তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। আজ আমাদের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এক গভীর অন্ধত্বের খাঁচায় বন্দি।

ন্যায়বিচারের মূল শর্ত হলো রাষ্ট্র নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিচারব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ফয়সালা করার প্রবণতা—যাকে আমরা ‘মব জাস্টিস’ বা জনরোষ বলে থাকি—আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অন্ধ উগ্রতা যখন বিচারকের আসন দখল করে নেয়, তখন প্রমাণের চেয়ে আবেগ ও গুজব বড় হয়ে ওঠে। পুলিশ প্রশাসন কিংবা আদালত অনেক সময় এই অন্ধ জনরোষের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করে। ফলে আইনের শাসন মার খায় এবং বিচারব্যবস্থা তার নিজস্ব গতি হারিয়ে অন্ধত্বের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।

একটি সুস্থ বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার পক্ষপাতহীন চরিত্র। কিন্তু যখন রাষ্ট্রে বা সমাজে বিশেষ কোনো গোষ্ঠী বা মতাদর্শের প্রভাব এমনভাবে বিস্তার লাভ করে যে, অপরাধীর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয় দেখে বিচার নির্ধারিত হয়, তখন আইনের শাসন প্রহসনে পরিণত হয়। অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সংখ্যালঘু নিপীড়ন, সামাজিক সহিংসতা কিংবা ভিন্নমতের ওপর হামলার ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীদের বিচারের আওতায় না এনে উল্টো আইনি মারপ্যাঁচে ভুক্তভোগীকে বলির পাঁঠা বানানোর নজির বহু রয়েছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিচারব্যবস্থার চোখকেই চিরতরে অন্ধ করে দেয়।

বিচারকদের স্বাধীনভাবে রায় দেওয়ার পরিবেশ না থাকলে ন্যায়বিচার অসম্ভব হয়ে পড়ে। যখন অন্ধ মৌলবাদ ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সামাজিক বয়কটের মাধ্যমে আদালতের রায়কে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে, তখন বিচারকদের সততা ও সাহসিকতা চরম পরীক্ষার মুখে পড়ে। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক সময় আইনি প্রক্রিয়া তার সঠিক পথ থেকে সরে আসে। বিচারালয়ের ভেতরে যদি ভীতি বা অন্ধকারের অনুশাসন কাজ করে, তবে সাধারণ মানুষ শেষ ভরসাস্থলটুকুও হারাতে বাধ্য হয়।

এই খাঁচা ভেঙে বিচারব্যবস্থাকে মুক্ত করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। বিচারালয়কে যেকোনো ধরনের গোষ্ঠীগত প্রভাব, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় চাপ এবং মব কালচার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে হবে। বিচারকদের সুরক্ষার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও বেশি দৃঢ় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইনি সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে কেউ অন্ধ আবেগের বশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস না পায়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *