সংবিধানের আলো নাকি অন্ধকারের ফতোয়া: কোন দিকে আমাদের সমাজ?

একটি আধুনিক, সভ্য এবং প্রগতিশীল রাষ্ট্রের পথচলা নির্ধারিত হয় তার সংবিধানের আলোয়—যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনই হলো সর্বোচ্চ পথ নির্দেশিকা। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়েও আমাদের সমাজকে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে এক অবক্ষয়িত শক্তির বিরুদ্ধে, যার প্রধান হাতিয়ার হলো মধ্যযুগীয় অন্ধকারের ফতোয়া। সংবিধানের সার্বজনীন অধিকারের আলো এবং উগ্র মৌলবাদের অন্ধ ফতোয়ার এই লড়াইয়ে আমাদের সমাজ আজ এক গভীর এবং বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের সংবিধানের মূল চেতনা হলো বৈষম্যহীনতা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার এবং সুরক্ষার গ্যারান্টি দেয় সংবিধান। এটি মানুষকে মুক্তি দেয় কূপমণ্ডূকতা থেকে, আর দেখায় যুক্তিবাদী ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন। যেখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় আইন ও সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, সেখানে প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকার কথা। সংবিধান হলো সেই আলোকবর্তিকা, যা অন্ধকার সমাজকে আলোর পথ দেখায়। খাতার পাতায় থাকা এই বিধানগুলো হলো একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মাপকাঠি।

এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে তথাকথিত ফতোয়া ও উগ্র মৌলবাদী মানসিকতা। এই অন্ধ শক্তির মূল অস্ত্র হলো ভয় দেখানো, সমাজকে বিভক্ত করা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে খর্ব করা। সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা, নারী স্বাধীনতা কিংবা ভিন্ন মতের ওপর ফতোয়ার খড়্গ ঝুলিয়ে তারা সমাজকে একটি রক্ষণশীল ও অসহিষ্ণু খাঁচায় বন্দি করতে চায়। প্রথাগত আবেগকে উসকে দিয়ে এবং ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা এই গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের কৌশল। ফতোয়া কখনোই বিচার বা কল্যাণের প্রতীক নয়; এটি হলো জ্ঞানহীনতা এবং অসহিষ্ণুতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

আইনের চোখে চোখ বাঁধা দেবীর মূর্তিটি হলো নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক। কিন্তু আমাদের বাস্তব সমাজে যখন বিচারব্যবস্থা অন্ধত্ব, কূপমণ্ডূকতা এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করে, তখন সেই প্রতীকী অন্ধত্ব এক ভয়ানক বঞ্চনার খাঁচায় পরিণত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিচারব্যবাকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ফয়সালা করার প্রবণতা—যাকে আমরা ‘মব জাস্টিস’ বলে থাকি—আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অন্ধ উগ্রতা যখন বিচারকের আসন দখল করে নেয়, তখন প্রমাণের চেয়ে আবেগ ও গুজব বড় হয়ে ওঠে। পুলিশ প্রশাসন কিংবা আদালত অনেক সময় এই অন্ধ জনরোষের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করে।

বিচারকদের স্বাধীনভাবে রায় দেওয়ার পরিবেশ না থাকলে ন্যায়বিচার অসম্ভব হয়ে পড়ে। হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সামাজিক বয়কটের মাধ্যমে আদালতের রায়কে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হলে আইনি প্রক্রিয়া তার সঠিক পথ থেকে সরে আসে।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হলো, রাষ্ট্রে সাংবিধানিক কাঠামোর সমান্তরালে এক ধরনের উগ্র গোষ্ঠীগত প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা চলছে। রাষ্ট্র যখন আইন ও আদালতের মাধ্যমে সমাজ পরিচালনা করতে চায়, তখন এই গোষ্ঠীগুলো সামাজিক বয়কট, হুমকি এবং মব কালচারের মাধ্যমে নিজস্ব অনুশাসন চাপিয়ে দিতে চায়। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তখন, যখন রাষ্ট্র বা প্রশাসন আইন প্রয়োগের চেয়ে কৌশলগত কারণে এই অন্ধ ফতোয়াগুলোর কাছে নমনীয়তা বা আপস করতে শুরু করে। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো যখন মাঠ গরম করে, তখন অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংবিধানের রক্ষক হিসেবে কাজ না করে উগ্রপন্থীদের দাবি মেনে নেয়। এই দুর্বলতা ফতোয়াবাজদের আরও বেশি উৎসাহিত করে।

আজকের দিনে সমাজ কোন দিকে এগোচ্ছে—এই প্রশ্নটি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে উঁকি দেওয়া উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অঙ্গন, সর্বত্রই এক অদৃশ্য ভয় কাজ করে। মানুষ তার সহজাত অধিকার প্রকাশের ক্ষেত্রে বারবার দ্বিধায় পড়ে। একটি জাতি তখনই সামনে এগোতে পারে যখন তার তরুণ সমাজ বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়, কুসংস্কারের বেড়াজাল ছিন্ন করে। কিন্তু অন্ধ ফতোয়ার রাজত্ব কায়েম হলে সমাজ পেছনের দিকে হাঁটতে বাধ্য হয়, যা পুরো জাতির মেধাকে স্থবির করে দেয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *