সংবিধানের খাতা আর মৌলবাদী ফতোয়া

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রতিটি সভ্য দেশের নিজস্ব কিছু লিখিত নিয়ম ও নীতিমালা থাকে, যাকে আমরা বলি সংবিধান। এটি কেবল কিছু অনুচ্ছেদের সমষ্টি নয়; এটি একটি জাতির মুক্তি সংগ্রাম, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসনের সর্বোচ্চ দলিল। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, খাতার পাতায় থাকা এই সংবিধানের পাশাপাশি আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে সমান্তরালভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে আরেকটি অদৃশ্য ও ভয়ংকর শক্তি—যাকে আমরা বলতে পারি “মৌলবাদী ফতোয়া”। একটি আধুনিক রাষ্ট্র ও মধ্যযুগীয় কূপমণ্ডূকতার এই দ্বৈরথ আজ আমাদের জাতীয় অস্তিত্বকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

আমাদের সংবিধানের মূল ভিত্তি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকার। জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ পরিচয় নির্বিশেষে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান—এই গ্যারান্টি সংবিধানই আমাদের দেয়। এটি মানুষকে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা দেয়, নারীদের অধিকার রক্ষা করে এবং সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার পথ উন্মুক্ত রাখে। খাতার পাতায় থাকা এই বিধানগুলো হলো একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মাপকাঠি। যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র এই সংবিধানের নির্দেশনায় চলে, ততক্ষণ পর্যন্ত নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকার কথা।

এর বিপরীতে, মৌলবাদী ফতোয়া হলো প্রথাগত কূপমণ্ডূকতা, অসহিষ্ণুতা এবং ভয়ের সংস্কৃতির প্রতীক। এই ফতোয়াগুলো কোনো আইনসভা বা আদালতের রায় থেকে আসে না, বরং আসে উগ্র ও সংকীর্ণ মানসিকতাসম্পন্ন কিছু গোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব থেকে। যারা সমাজকে নিজেদের খামখেয়ালে চালাতে চায়, তারা ফতোয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। কখনো নারীর পোশাক বা চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা, কখনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা, আবার কখনো ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সামাজিক বয়কট—এসবই ফতোয়ার নিকৃষ্ট রূপ। এদের মূল উদ্দেশ্য হলো সংবিধানের পাতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সমাজে নিজস্ব হুকুমত কায়েম করা।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তখন, যখন রাষ্ট্র বা প্রশাসন আইন প্রয়োগের চেয়ে কৌশলগত কারণে এই অন্ধ ফতোয়াগুলোর কাছে নমনীয়তা বা আপস করতে শুরু করে। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো যখন মব কালচার বা হুমকির মাধ্যমে মাঠ গরম করে, তখন অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংবিধানের রক্ষক হিসেবে কাজ না করে পরিস্থিতি সামলানোর অজুহাতে উগ্রপন্থীদের দাবি মেনে নেয়। এই দুর্বলতা ফতোয়াবাজদের আরও বেশি উৎসাহিত করে। ফলস্বরূপ, সংবিধানের খাতা ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং ফতোয়ার খড়্গ সমাজের প্রতিটি স্তরে চেপে বসে।

আজ আমাদের সামনে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সংবিধানের আলোয় একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাঁচব, নাকি অন্ধ ফতোয়ার অন্ধকারে তলিয়ে যাব? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা বিচারালয়—সব জায়গায় যদি এই ফতোয়ার দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে, তবে নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। মেধা, যুক্তি এবং প্রগতির জায়গা দখল করবে অন্ধ বিশ্বাস ও বলপ্রয়োগ।

সংবিধানের খাতা এবং মৌলবাদী ফতোয়া কখনো একসঙ্গে চলতে পারে না। একটি রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে সংবিধানের সুশাসন এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। অন্ধ ফতোয়ার বিরুদ্ধে প্রয়োজন রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত এবং আপসহীন প্রতিরোধ। খাতার পাতার আইনকে যখন বাস্তবে বলবৎ করা যাবে এবং উগ্রবাদীদের সমস্ত ফতোয়াকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে, কেবল তখনই একটি সত্যিকার স্বাধীন, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *